বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। বাংলা রচনা

বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপঃ

ভূমিকা :

বিজ্ঞান মানবজীবনে ক্রমবিকাশে উন্নতির শিখরে পৌছানাের সােপান। কিন্তু সেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। সেই প্রেক্ষিতে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’–এ জাতীয় শিরােনামে কোনো কিছু লিখতে গেলেই মনে পড়ে এইচ জি ওয়েলস এর গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্তব্য—“বিজ্ঞানকে আমরা রাক্ষসের আকার দান করেছি; যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় দ্বারা আমরা সেই রাক্ষসী মূর্তিকে সংযত করার চেষ্টা না করি, তাহলে সত্যি-সত্যিই ধ্বংস পাবে।”—কিন্তু কেন এই প্রশ্ন? কেন এই গভীর সংশয় ? প্রশ্ন সাধারণ মানুষের, সংশয় শিক্ষার্থীদের। বিজ্ঞান তাে কোনাে জীবসত্তা নয়। তা মানুষেরই বিশেষজ্ঞান, প্রমাণ, যুক্তি, আর অভিজ্ঞতার দ্বারা নির্মিত। মানুষ তার স্রষ্টা, তার প্রয়ােগ কর্তা। হ্যাঁ মানুষেরই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজ্ঞান হয়ে ওঠে শতঘ্নী আয়ধু, দু-টুটো মহাযুদ্ধে সভ্যতা ধ্বংসের কারণ, হিরােশিমা-নাগাসাকির ভয়াবহ স্মৃতি, ভিয়েতনামের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। আবার মানুষেরই শুভবুদ্ধিতে তা বিশল্যকরণী, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিধায়ক।

প্রয়ােগ ভেদে বিজ্ঞানের দ্বৈতরূপ :

বিজ্ঞান নামক এই আশ্চর্য শক্তি মানুষের শুভংকর পরিচালনায় মানুষকে এনে দিয়েছে প্রভৃতি সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য। শিক্ষা, ভ্রমণ, প্রয়ােজন, সমৃদ্ধি এবং উন্মেষ-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অফুরন্ত আশীর্বাদ হয়েছে দৃশ্যমান। বিজ্ঞানকে বাহন করেই মানুষ আজ ব্যাধির বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছে সফল প্রতিরােধ, জীবনের প্রত্যহিকতায় নিয়ে এসেছে গতি, আরাম এবং উৎকর্ষ। কিন্তু চন্দ্রকেও ম্লান করে তার কলঙ্ক, তেমনি বিজ্ঞানকেও কলুষিত করে মূঢ়, মদগর্বী মানুষ। তাই বিজ্ঞান থেকেই জন্ম নিয়েছে বিধ্বংসী মেশিনগান, বােমা, ট্যাঙ্ক ; ভি-ওয়ান, ডি-টু রকেট, ফাইটার বম্বার, নাপাম বােমা—এমন কী মহাঘাতক পারমাণবিক অস্ত্র।

আশীর্বাদের উদাহরণ :

বিজ্ঞান জুগিয়েছে তৃষ্ণা ও সেচের জল, দেখার জন্য আলাে, স্বচ্ছন্দ্যের জন্য পাখা, এয়ার-কন্ডিশনার, রুম-হিটার, জীবনের কত বিচিত্র উপকরণ। কাগজ ও মুদ্রাকেন্দ্রের আবিষ্কার সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব করে তুলেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে হয়েছে অভূতপূর্ব উন্নতি।

 বিজ্ঞানের অভিশপ্ত ব্যবহার :

অন্যদিকে বর্তমান, শতাব্দীতেই বিশ্বযুদ্ধের নামে পৃথিবীতে ঘটে গেছে দুটি উন্মক্ত নরমেধ যজ্ঞ। এইসব যুদ্ধে বিজ্ঞানের গায়ে কলঙ্ক-কালিমা লাগিয়েছে স্বার্থলােভী কিছু মূঢ় শান্তিদ্রোহী মানুষ। তাদের প্রচণ্ড জিঘাংসাকে চরিতার্থ করতে বিজ্ঞানকে তারা ব্যবহার করেছেন নরহত্যার মারণ খেলায়। তাদের শৃঙ্খলে বিজ্ঞান তৈরি করেছে সেই পারমাণবিক বােমা, হিরােশিমা ও নাগাসাকির অসহায় প্রান্তরে যা চিরদিনের মতন পৃথিবীর ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত। মনুষ্যত্বের করুণতম অবমাননায় এভাবেই বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা হয়েছে। শুভংকরের আসন দখল করেছে নিষ্ঠুর ভয়ংকর।।

 উপসংহার :

বস্তুত, বিজ্ঞান যেখানে আশীর্বাদ, সেখানে কৃতিত্ব মানুষের, বিজ্ঞান যেখানে অভিশাপ, সেখানে মানুষেরই কলঙ্ক। একমাত্র মানুষই পারে রুদ্রের দক্ষিণ মুখ দেখিয়ে বিজ্ঞানকে প্রচলিত অর্থে অসৎ থেকে সৎ-এ নিয়ে আসতে, তমসা থেকে জ্যোতি দীক্ষায় পবিত্র করতে, মৃত্যু থেকে অমৃতের স্পর্শে ধন্য করতে এ প্রত্যাশা অতিরিক্ত কি না জানি না। তবু এ প্রত্যাশা না করে আমাদের উপায় নেই।

 

এছাড়াও পড়ুনঃ পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

x