প্রশ্নঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ আলােচনা কর।

প্রশ্নঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ আলােচনা কর। 

উঃ ভূমিকা ঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। পৃথিবী পুনরায় যাতে এরূপ ধংসলীলার সম্মুখীন না হয় তার জন্য মানুষ সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শান্তিকামী মানুষের যাবতীয় শুভ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে মাত্র ২০ বছরের মধ্যে পৃথিবী আরাে একবার সর্বনাশা যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানির পােল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্রে। একাধিক কারণের সমষ্টিগত ফল ছিল এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

(১) ভার্সাই চুক্তির ত্রুটিঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়েছিল ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে। কিন্তু এই সন্ধির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে পরাজিত জার্মানির উপর একতরফাভাবে জোরপূর্বক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। শর্তে সামরিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক দিয়ে জার্মানিকে পঙ্গু করার চেষ্টা করা হয়। সম্মেলনে জার্মান প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ অপরাধীর ন্যায় ব্যবহার করা হয়। স্বভাবতই জার্মান। জাতীয়বাদীরা অপমানজনক এই সন্ধিকে মেনে নিতে পারেন নি। কাজেই বেকারত্ব, দারিদ্র, খাদ্যাভাবে জর্জরিত জার্মানির জনগণ এই অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে কোন মূল্যে ভার্সাই চুক্তিকে ভেঙ্গে ফেলতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

(২) মতাদর্শগত দ্বন্দ্বঃ

 মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় সাহায্য করে। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা ঘাত প্রতিঘাতে বিভিন্ন আদর্শে জম্ম হয়। একদিকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশগুলি গণতান্ত্রিক আদর্শ, অন্যদিকে জার্মানি, ইতালি প্রভৃতি দেশ একনায়কতন্ত্রের ধৃজা তুলে ধরে। রাশিয়াতে প্রসার ঘটে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে। দেশগুলির মধ্যে এই মতাদর্শগত পার্থক্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করে।।

(৩) জাতিসংঘের ব্যর্থতা :

 জাতিসংঘের ব্যর্থতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশ্বে শান্তি, স্থিতাবস্থা স্থাপনের মহান উদ্দেশ্য। নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাতিসংঘ নিজস্ব সৈন্যবাহিনীর অভাব, বৃহৎ শক্তিগুলির। অনুপস্থিতি, সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার অক্ষমতা প্রভৃতি দূর্বলতা হেতু নিজ দায়িত্ব পালনে। ব্যর্থ হয়। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্মে পটভূমি তৈরী হয়।

(৪) তােষণ নীতি ঃ 

ঐতিহাসিক টেলরের মত বহু ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য। ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের তােষণ নীতিকে দায়ী করেছে। হিটলার, মুসােলিনি প্রমুখর জন্সি। সমপ্রসারণবাদ বা সাম্রাজ্যবাদী লিঙ্গাকে থামাতে পারত বৃহৎ শক্তিগুলির মিলিত প্রয়াস।। কিন্তু ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশগুলি তা না করে শাসকদের তােষামােদ করতে থাকে, ফলে হিটলারের সাম্রাজ্য ক্ষুধা, ঔদ্ধত্ব বাড়তে থাকে, যার পরিণাম হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।।

(৫) ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা : 

ঔপনিবেশিক প্রতিযােগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তােলে। ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানিকে ঔপনিবেশিক দিক দিয়ে পণু করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মিত্রশক্তির দেশগুলি তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত থাকে। অপরদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার স্থান সঙ্কলন, শিল্পের কাঁচামালের যােগান নিশ্চিত, উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের জন্য বাজার দখল প্রভৃতি প্রয়ােজনে জার্মানি, জাপানের মত  দেশগুলির কাছে উপনিবেশ বিস্তার জরুরী হয়ে পড়ে এবং তারা এই কাজে অগ্রসর হয়। ফলে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

(৬) পরস্পরবিরােধী রাষ্ট্রজোট ঃ

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মত দ্বিতীয় বিশ্বযুঞ্জে প্রাক্কালেও সমগ্র বিশ্ব পরস্পরবিরােধী শক্তিজোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্ববর্তী ত্রিশক্তি মৈত্রী, ত্রিশক্তি। আঁতাতের মধ্যে গড়ে ওঠে অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি। এই দুই জোটের মধ্যে অস্ত্রসজ্জার প্রতিযােগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।

(৭) পাশ্চাত্য দেশগুলির মূঢ়তাঃ

পাশ্চাত্য দেশগুলির রাশিয়া সম্পর্কে অবিশ্বাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তােলে। এই অবিশ্বাসের দরুন ‘মিউনিক চুক্তি সম্পাদনের সময় রাশিয়াকে তারা আমন্ত্রণ জানায় নি।মিউনিকে রাশিয়ার অনুপস্থিতি চেকোশ্লাভিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। পাশ্চাত্য দেশগুলির তােষামােদে আত্মগর্বী হিটলার চেকোশ্লোভিয়ার প্রতিরক্ষার জন্য দেওয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি নস্যাৎ করে দেয়।

 (৮) নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের ব্যর্থতা :

 মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের চৌদ্দ দফা শর্তের ভিত্তিতে প্যারিসের শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই শর্তের অন্যতম ছিল নিরস্ত্রীকরণ। এই উদ্দেশ্যেই জেনেভাতে নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন আহূত হয়। কিন্তু লীগের। বৃহৎ সদস্য রাষ্ট্রগুলির সদিচ্ছার অভাবে এই সম্মেলন ব্যর্থ হয়, লীগ অসহায় হয়ে পড়ে এবং বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন হয়ে পড়ে।

 (৯) হিটলারের দায়িত্বঃ

 নাৎসী নেতা হিটলারের কুর, পাশবিক কূটনীতি ও নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য অনেক পরিমানে দায়ী। ছলেবলে কৌশলে। হিটলার একের পর এক প্রতিবেশি রাজ্য গ্রাস করতে থাকলে বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পরে।

(১০) ইতালি, জাপানের দায়িত্বঃ

  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য শুধুমাত্র হিটলারের সাম্রাজ্য লিঙ্গাই দায়ী ছিল না। ফ্যাসিস্ট ইতালির বিস্তার নীতি, জাপানের সময় জম্মিবাদী নীতিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল।

(১১) প্রত্যক্ষকারণঃ 

 বিভিন্ন কারণে যুদ্ধের ক্ষেত্র যখন প্রস্তুত তখন তাতে অগ্নিসংযােগের কাজ করে হিটলার কর্তৃক পােল্যান্ড আক্রমণের ঘটনা। বৃহৎ শক্তিবর্গ হিটলার সম্পর্কে সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে হিটলারের ঔদ্ধত্ব বৃদ্ধি পায়। চেকোশ্লাভিয়া দখলের পর হিটলার পােল্যান্ডের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন। ১৯৩৯ খ্রিঃ ১লা সেপ্টেম্বর তিনি পােল্যান্ড আকমণ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের এতদিনের তােষণ নীতি পরিহার করে যুদ্ধ ঘোষণা করলে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

x